কোটা, না মেধা– এটাই কি মূল প্রশ্ন?
গত জুলাই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিল “কোটা না মেধা”। পুরো আন্দোলন জুড়ে স্লোগানটি মুখরিত হচ্ছিল। তারা অধিকাংশই কোটার বিপক্ষে ও মেধার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে সরকারি চাকুরির বিরাট অংশ (৩০%, এবং সবমিলিয়ে ৫৬%) খেয়ে নিচ্ছিল তখন তার বিরুদ্ধে ন্যায্যতই ছাত্র সমাজ রুখে দাড়িয়েছিল। তারা এমন ধারার কোটাকে বিরোধিতা করেন এবং কোটার সংস্কার চান। পরে তারা এমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যাতে মেধাবী না হয়েও একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি কোটার জোরে চাকুরি পেয়ে যাচ্ছে, আর মেধা থাকা সত্ত্বেও একজন চাকরি পাচ্ছে না। তাই, স্লোগান ওঠেÑ কোটা না মেধা, মেধা মেধা।
কিন্তু শিক্ষিত ছাত্র-তরুণদের চাকরি না পাবার এটাই কি আসল কারণ? মেধাবীরা ভালো চাকরি পাবে, ভালো থাকবে। আর কম মেধাবীরা চাকরি পাবে না। এটাই কি তাহলে ন্যায্য?
আজকের সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শ্রমিক-কৃষকের সন্তানেরা মেধার প্রতিযোগিতায় বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া টিকবে না। কারণ জন্মসূত্রেই তারা বৈষম্যের শিকার। তাদের থাকে পুষ্টির অভাব, থাকেন খারাপ পরিবেশে, মা-বাবা অশিক্ষিত, বাল্যকাল থেকে তাদের স্বাস্থ্য ও পড়াশুনায় থাকে পরিচর্যার অভাব, ভাল স্কুলে পড়া ও টিউটর থেকে বঞ্চিত থাকে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যায়বহুল পড়াশোনা করার সাধ্য তাদের নেই। করোনা কালেও যখন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা-কার্যক্রম চলছিল তখন শ্রমিক-কৃষকের সন্তানরা হয় গার্মেন্টসে ঢুকেছে, বা বাসা-বাড়ীর কাজে অথবা বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে সংসার সামলাচ্ছে। ছেলেরা অনেকেই উৎপাদনে যুক্ত বাবাকে সাহায্য করছে। যা উচ্চবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের করতে হয়নি বা করতে হচ্ছে না। তাদের সন্তানরা বিশেষ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। ফলে তারা স্বভাবতই দরিদ্র শ্রেণির সন্তানদের চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো ফল করে, তারা মেধাবী হিসেবে পরিচিত হয়।
পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো প্রকট। পাহাড় বা অন্যান্য প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা শহরের বা রাজধানীর শিক্ষার্থীদের তুলনায় নানান সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রতিবন্ধী-হিজড়া জনগোষ্ঠী সামাজিকভাবেই বঞ্চিত। শিক্ষা-চাকরির ক্ষেত্রে এ বৈষম্য আরও তীব্র। ২/১ জন চাকরি করার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগই বৈষম্যমূলক এ সমাজে বঞ্চিত।
বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যই মেধার বিকাশের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। মেধার ভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা হলে সমাজে বৈষম্য থেকেই যাবে। আর মেধার ভিত্তিতে চাকরি হলেও তরুণদের বেকার সমস্যার সমাধান হবে না।
আসল সমস্যা হলো শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের সমস্যা। বিদ্যমান মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষিত তরুণদের পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই। বেকারত্ব পুঁজিবাদের একটি আবশ্যিক রোগ। কখনো তা বাড়ে, কখনো কমে। আমাদের দেশে সেটা স্থায়ী রোগ, এবং তা ব্যাপক। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় উচ্চ-শিক্ষিত (স্নাতক পাশ) তরুণদের প্রায় ৩০% বেকার। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ধরলে তার হার ৫০%-এর বেশি।
তাই, এ ব্যবস্থায় যদি ধরেও নেয়া হয় যে, মেধাবীদের একটা অংশ চাকরি পেলো, কিন্তু ব্যাপক যে শিক্ষিত-বেকারত্ব, সেটা থাকছেই।
মেধাকে মূল্য দেয়াই বেকারত্ব সমস্যার সমাধান নয়। বরং বেকারত্ব সমস্যার আসল কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থা। একে উচ্ছেদ করাই এর একমাত্র সমাধান। যা বেকার তৈরি করবে না, প্রতিটি হাতকে কাজ দেবে, শ্রমকে ঘৃণা করা হবে না, কোনো কাজকে ছোটো মনে করা হবে নাÑ ইত্যাদি।
শিক্ষিত তরুণদেরকে সেজন্যই সংগ্রাম করতে হবে। তাদের স্লোগান তুলতে হবে, বেকারত্ব সমস্যার সমাধান চাই, প্রতিটি তরুণের চাকরি/কাজ চাই।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কোটা, না মেধা– এটাই কি মূল প্রশ্ন?
গত জুলাই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান ছিল “কোটা না মেধা”। পুরো আন্দোলন জুড়ে স্লোগানটি মুখরিত হচ্ছিল। তারা অধিকাংশই কোটার বিপক্ষে ও মেধার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে সরকারি চাকুরির বিরাট অংশ (৩০%, এবং সবমিলিয়ে ৫৬%) খেয়ে নিচ্ছিল তখন তার বিরুদ্ধে ন্যায্যতই ছাত্র সমাজ রুখে দাড়িয়েছিল। তারা এমন ধারার কোটাকে বিরোধিতা করেন এবং কোটার সংস্কার চান। পরে তারা এমন বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যাতে মেধাবী না হয়েও একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি কোটার জোরে চাকুরি পেয়ে যাচ্ছে, আর মেধা থাকা সত্ত্বেও একজন চাকরি পাচ্ছে না। তাই, স্লোগান ওঠেÑ কোটা না মেধা, মেধা মেধা।
কিন্তু শিক্ষিত ছাত্র-তরুণদের চাকরি না পাবার এটাই কি আসল কারণ? মেধাবীরা ভালো চাকরি পাবে, ভালো থাকবে। আর কম মেধাবীরা চাকরি পাবে না। এটাই কি তাহলে ন্যায্য?
আজকের সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শ্রমিক-কৃষকের সন্তানেরা মেধার প্রতিযোগিতায় বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া টিকবে না। কারণ জন্মসূত্রেই তারা বৈষম্যের শিকার। তাদের থাকে পুষ্টির অভাব, থাকেন খারাপ পরিবেশে, মা-বাবা অশিক্ষিত, বাল্যকাল থেকে তাদের স্বাস্থ্য ও পড়াশুনায় থাকে পরিচর্যার অভাব, ভাল স্কুলে পড়া ও টিউটর থেকে বঞ্চিত থাকে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যায়বহুল পড়াশোনা করার সাধ্য তাদের নেই। করোনা কালেও যখন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা-কার্যক্রম চলছিল তখন শ্রমিক-কৃষকের সন্তানরা হয় গার্মেন্টসে ঢুকেছে, বা বাসা-বাড়ীর কাজে অথবা বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে সংসার সামলাচ্ছে। ছেলেরা অনেকেই উৎপাদনে যুক্ত বাবাকে সাহায্য করছে। যা উচ্চবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের করতে হয়নি বা করতে হচ্ছে না। তাদের সন্তানরা বিশেষ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। ফলে তারা স্বভাবতই দরিদ্র শ্রেণির সন্তানদের চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো ফল করে, তারা মেধাবী হিসেবে পরিচিত হয়।
পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো প্রকট। পাহাড় বা অন্যান্য প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা শহরের বা রাজধানীর শিক্ষার্থীদের তুলনায় নানান সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রতিবন্ধী-হিজড়া জনগোষ্ঠী সামাজিকভাবেই বঞ্চিত। শিক্ষা-চাকরির ক্ষেত্রে এ বৈষম্য আরও তীব্র। ২/১ জন চাকরি করার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগই বৈষম্যমূলক এ সমাজে বঞ্চিত।
বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যই মেধার বিকাশের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। মেধার ভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা হলে সমাজে বৈষম্য থেকেই যাবে। আর মেধার ভিত্তিতে চাকরি হলেও তরুণদের বেকার সমস্যার সমাধান হবে না।
আসল সমস্যা হলো শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের সমস্যা। বিদ্যমান মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষিত তরুণদের পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই। বেকারত্ব পুঁজিবাদের একটি আবশ্যিক রোগ। কখনো তা বাড়ে, কখনো কমে। আমাদের দেশে সেটা স্থায়ী রোগ, এবং তা ব্যাপক। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় উচ্চ-শিক্ষিত (স্নাতক পাশ) তরুণদের প্রায় ৩০% বেকার। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ধরলে তার হার ৫০%-এর বেশি।
তাই, এ ব্যবস্থায় যদি ধরেও নেয়া হয় যে, মেধাবীদের একটা অংশ চাকরি পেলো, কিন্তু ব্যাপক যে শিক্ষিত-বেকারত্ব, সেটা থাকছেই।
মেধাকে মূল্য দেয়াই বেকারত্ব সমস্যার সমাধান নয়। বরং বেকারত্ব সমস্যার আসল কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থা। একে উচ্ছেদ করাই এর একমাত্র সমাধান। যা বেকার তৈরি করবে না, প্রতিটি হাতকে কাজ দেবে, শ্রমকে ঘৃণা করা হবে না, কোনো কাজকে ছোটো মনে করা হবে নাÑ ইত্যাদি।
শিক্ষিত তরুণদেরকে সেজন্যই সংগ্রাম করতে হবে। তাদের স্লোগান তুলতে হবে, বেকারত্ব সমস্যার সমাধান চাই, প্রতিটি তরুণের চাকরি/কাজ চাই।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র
